১১ই জুলাই, ২০২০ ইং , ২৭শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ




৮ এপ্রিল, ২০২০ , ১২:৩০ আপডেট: ১০ এপ্রিল, ২০২০ ,১৬:৪০

ক্রিকেটে প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যান বধে কত অস্ত্রই না আছে বোলারদের। প্রচন্ড গতির সঙ্গে দুর্দান্ত সুইংয়ের মিশেলে ব্যাটসম্যানের উইকেট উপড়ে ফেলার নজির আছে শতশত। বড় বড় টার্নে ব্যাটসম্যানকে বোকা বানিয়ে উইকেট শিকারের ঘটনা আছে ভুরিভুরি। সঙ্গে ‘ডেডলি বাউন্সার’ আর ‘পারফেক্ট ইয়র্কারের’ দেখাও মেলে প্রচুর।

কিন্তু সব ছেড়ে ‘আন্ডারআর্ম’ (মাটি দিয়ে গড়িয়ে বল করে) ডেলিভারি ছুড়ে বিপক্ষের ব্যাটসম্যানকে বিগ শট খেলা থেকে বিরত রাখার মত অখেলোয়াড়চিত ঘটনা আছে কেবল একটি।

সেটা ১৯৮১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে। প্রায় ৫৩ হাজার দর্শকের সামনে অধিনায়ক ও বড় ভাই গ্রেগ চ্যাপেলের পরামর্শে নিউজিল্যান্ড ব্যাটসম্যান ব্রায়েন ম্যাকেঞ্জিকে আটকাতে ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে প্রথম ‘আন্ডারআর্ম’ ডেলিভারি করে নিন্দিত ও যারপরনাই সমালোচিত হন ট্রেভর চ্যাপেল।

সেটা ছিল বেনসন-হেজেস ওয়ার্ল্ড সিরিজের পাঁচ ম্যাচ ফাইনালের তৃতীয় ম্যাচ। শেষ বলে নিউজিল্যান্ডের দরকার ছিল ৬ রান। ব্যাটসম্যান ছিলেন কিউই ফাস্ট বোলার ব্রায়েন ম্যাকেঞ্জি। ছক্কা হজম করলে ম্যাচ শেষ- এই চিন্তায় অধিনায়ক গ্রেগ চ্যাপেল শেষ ডেলিভারির আগে ছোট ভাই ট্রেভর চ্যাপেলের সামনে এসে তাকে আন্ডারআর্ম বল করার নির্দেশ দেন।

তা মেনে মাটি দিয়ে গড়িয়ে বল ছুড়ে ইতিহাসের ঘৃণ্য ও ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্ম দেন ট্রেভর চ্যাপেল। অজি ক্রিকেট হয় কলঙ্কিত। প্রায় চার দশক পেরিয়ে গেলেও, আজও ক্রিকেট অনুরাগিদের কাছে ট্রেভর চ্যাপেলের সেই মাটি দিয়ে গড়িয়ে বল করাটা চরম গর্হিত ও ক্রিকেটের মর্যাদাহানির ঘটনা হিসেবেই পরিগণিত হয়।

আচ্ছা, জানেন কি ক্রিকেট ইতিহাসের সেই নিন্দিত-সমালোচিত ট্রেভর চ্যাপেল যে বাংলাদেশে কোচিং করাতে এসেও এক ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্ম দিয়েছিলেন?

বাংলাদেশ প্রকোশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) মাঠে টিম বাংলাদেশের অনুশীলনের পাকিস্তানের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান জাভেদ মিঁয়াদাদের সঙ্গে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঝগড়া বাধিয়ে আবার বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন এ অস্ট্রেলিয়ান।

বাংলাদেশ জাতীয় দলের অনুশীলনে হেড কোচ ট্রেভর চ্যাপেলের সঙ্গে কবে কী নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল জাভেদ মিঁয়াদাদের? পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ও কোচ মিঁয়াদাদই বা বাংলাদেশের প্র্যাকটিসে কী করতে এসেছিলেন? তার সঙ্গে কী নিয়ে বাকবিতন্ডার একপর্যায়ে ট্রেভর চ্যাপেল কড়া ভাষায় ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন?

নিশ্চয়ই তা জানতে ইচ্ছে করছে। জাগো নিউজের পাঠকদের জন্য এ প্রতিবেদনে থাকছে সেই দিনে ট্রেভর চ্যাপেল আর জাভেদ মিঁয়াদাদের ঝগড়ার বর্ণনা। সেদিন ঐ ঘটনার সঙ্গে যিনি পরোক্ষভাবে জড়িয়ে ছিলেন, সেই ক্রিকেট কোচ সারোয়ার ইমরানের মুখ থেকেই শোনা যাক ঘটনাটি।

রাজ্যের উৎসাহ আর কৌতূহলের সঙ্গে দুটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্নও নিশ্চয় উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। ট্রেভর চ্যাপেল তখন বাংলাদেশের হেড কোচ, তাহলে জাভেদ মিঁয়াদাদ কেন সেদিন মাঠে ছিলেন? আর সারোয়ার ইমরানেরই বা ঘটনার সঙ্গে সম্পর্ক কী?

প্রথম কথা হলো, ২০০১ সালের শুরুর দিকে বাংলাদেশের হেড কোচের দায়িত্ব পান ট্রেভর চ্যাপেল। কিন্তু তার কোচিংয়ে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হচ্ছে না দেখে ব্যাটসম্যানদের নিয়ে কাজ করার জন্য জাভেদ মিঁয়াদাদকে অল্প সময়ের জন্য ব্যাটিং উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল ক্রিকেট বোর্ড। সেদিন বুয়েট মাঠে ব্যাটিং উপদেষ্টা হিসেবেই ছিলেন মিঁয়াদাদ। আর সারোয়ার ইমরান তখন জাতীয় দলের প্রধান সহকারী কোচ।

আপনি তো সেদিন বুয়েট মাঠে ছিলেন। আপনার চোখের সামনেই ঘটনা। আসলে কী ঘটেছিল ট্রেভর চ্যাপেল আর জাভেদ মিঁয়াদাদের মধ্যে?- জাগো নিউজের পক্ষ থেকে এমন প্রশ্ন করা হলে সারোয়ার ইমরান তার স্মৃতির ঝাপি খোলেন।

বলেন, ‘দিনক্ষণ মনে নেই। তবে সম্ভবত সেটি ২০০১ সালের মাঝামাঝি বা তার কিছুদিন পর। ট্রেভর চ্যাপেল তখন বাংলাদেশ জাতীয় দলের হেড কোচ। আমি প্রধান সহকারী কোচ। জাতীয় দলের প্রস্তুতি ক্যাম্প চলছিল বুয়েট মাঠে। সেদিন ছিল প্র্যাকটিস ম্যাচ।

সকালে প্রস্তুতি ম্যাচ শুরুর আগে ট্রেভর চ্যাপেল এসে আমাকে বললেন, “ইমরান এক কাজ করো, তুমি আম্পায়ারিং করো। আমি মাঠের বাইরে থেকে ম্যাচটা দেখি। কার কী অ্যাপ্রোচ সেটা বাইরে থেকে আরও ভাল বোঝা যাবে। আর ম্যাচ চলাকালীন কাউকে মাঠে ঢুকতে দিও না”- এই বলে ট্রেভর চ্যাপেল চলে গেলেন মাঠের বাইরে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রস্তুতি ম্যাচ দেখছিলেন।

হঠাৎ দেখি মাঠের এক কোনায় আমাদের অতি পরিচিত মুখ ওয়াসিমের সঙ্গে (ওয়াসিম খান, ক্রিকেট সংগঠক ও বিভিন্ন সময় বিসিবির নানা স্ট্যান্ডিং কমিটিতে জড়িত) মাঠে ঢুকছেন জাভেদ মিঁয়াদাদ। আমি জানতাম, ট্রেভর চ্যাপেল রাগচটা মানুষ। আর আমাকে বলেও গেছেন, “কাউকে ম্যাচ চলাকালীন মাঠে ঢুকতে দিও না।” কাজেই আমি ছুটে গেলাম মিঁয়াদাদের কাছে। বললাম, “জাভেদ ভাই , গা গরমের ম্যাচ চলছে। হেড কোচ ট্রেভর আমাকে বলেছেন খেলা চলাকালীন কাউকে মাঠে না যেতে। আপনি মাঠে ঢুইকেন না। অপেক্ষা করুন। বসে ম্যাচ দেখেন। তারপর না হয় ক্রিকেটার ও আমাদের সাথে কথা বলবেন।”

কিন্তু জাভেদ মিঁয়াদাদ আমার কথা শুনলেন না। মৃদু হেসে উর্দুতে বললেন, ‘আরে ইয়ার ঠিক হ্যায়। তুম ফিকার মাত কারো। কই প্রবলেম নেই হোগা (আরে ভাই তুমি কিছু ভেবো না, কিছু হবে না)”- এই বলে মিঁয়াদাদ যেই না মাঠে ঢুকেছেন আর অমনি ছুটে আসলেন চ্যাপেল। একেবারে ‘অগ্নিশর্মা’ যাকে বলে।

তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে জাভেদ মিয়াদদকে বেশ উচ্চস্বরে কথা শোনালেন। বললেন, “আমি হেড কোচ, আমার অনুমতি ছাড়া আপনাকে ম্যাচ চলার সময় মাঠে ঢোকার অনুমতি কে দিয়েছে?” আরও কিছু কথা বলেছিলেন এবং সবকটা কথাই অত্যন্ত উত্তেজিত অবস্থায় এবং রীতিমত ক্রুর অভিব্যক্তিতে। জাভেদ মিঁয়াদাদও একদম চুপ ছিলেন না। তিনি পাল্টা জবাব দিলেন। কিন্তু ট্রেভর চ্যাপেলের উত্তেজনা কিছুতেই থামানো যাচ্ছিল না। যা হোক পরে একসময় গিয়ে ঠান্ডা হলেন। জাভেদ মিঁয়াদাদও আর সেই বচসার পর দেরি করেননি বুয়েট মাঠ ছেড়ে চলে গেলেন হোটেলে।’

বলার অপেক্ষা রাখে না, ২০০০ সালে টেস্ট শুরুর অল্প কিছুদিন পরেই টিম বাংলাদেশের সব দায়িত্ব তুলে নেন দক্ষিণ আফ্রিকান হাই প্রোফাইল কোচ ও অ্যানালিস্ট এডি বার্লো। কিন্তু তিনি অসুস্থ হয়ে দেশে ফিরে গেলে দায়িত্ব পান ট্রেভর চাপেল।

কিন্তু টেস্ট ফরম্যাটে পথচলা শুরুর পর ঐ সময়টা পারফরমেন্স মোটেই ভাল ছিল না। হার ও ব্যর্থতাই ছিল সঙ্গী। বিশেষ করে ব্যাটিংয়ের অবস্থা ছিল বেশ খারাপ। সেই ব্যাটিং দুর্বলতা কাটাতে এবং ব্যাটসম্যানদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাহস-আত্মবিশ্বাস বাড়ানর লক্ষ্যে তখনকার বোর্ডকর্তারা সাত-আট দিনের জন্য ব্যাটিং পরামর্শক হিসেবে নিয়ে আসেন জাভেদ মিঁয়াদাদকে। তিনি ব্যাটসম্যানদের নিয়ে কাজ করেন, বিকেএসপিতে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে কিছু বিশেষ ট্রেনিং সেশনও কাটান।

কিন্তু আসল কথা হলো, মিঁয়াদাদকে ব্যাটিং কনসালটেন্ট নিয়োগ দেয়া নিয়েই বাধে গন্ডগোল। অস্টেলিয়ান ট্রেভর চ্যাপেল তা মানতে পারেননি এবং যতদূর জানা যায়, ততকালীন বোর্ড কর্তারাও ট্রেভর চ্যাপেলের সাথে কথা বলে মিঁয়াদাদকে ব্যাটিং পরামর্শক নিয়োগ দেয়নি। তা নিয়েই বোর্ডের সঙ্গে একটা মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল ট্রেভর চ্যাপেলের।

ধরা হয়, ঐ অস্ট্রেলিয়ান কোচ জাভেদ মিঁয়াদাদকে মাঠে না ঢোকার কথাটি রীতিমত কড়া ভাষায় শাসানোর সুরে বলেছিলেন সে কারণেই। তবে ইতিহাস জানাচ্ছে, তারপর আর বেশিদিন কাজ করা হয়নি ট্রেভর চ্যাপেলের। ২০০২ সালেই চাকুরিচ্যুত হন এ অস্ট্রেলিয়ান।

বিকেএসপির ইনডোরে মার্বেল পাথরের স্লাব বসিয়ে তার মধ্যে বল ফেলে ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং করান মিঁয়াদাদ। ঐ সময় এ প্রতিবেদকসহ উপস্থিত সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপে তিনি বলেছিলেন, ‘ফাস্ট বোলিং খেলতে গেলে বুক ভরা সাহস দরকার। আর দ্রুতগতির বল মোকাবিলার অভ্যাস করতে হবে।’

যেহেতু বাংলাদেশের উইকেট ধীরগতির, বাউন্সও কম। তাই মার্বেল পাথরের স্লাব বসিয়ে তার ওপর বল ফেলে ব্যাটসম্যানদের প্র্যাকটিস করানোর জোর তাগিদ দিয়েছিলেন পাকিস্তানের অন্যতম সেরা উইলোবাজ। তার দর্শন ছিল মার্বেল পাথরের স্লাবে বল পড়লে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত ব্যাটে আসে। এভাবে নিয়মিত অনুশীলন করলে মাঠে গিয়ে ফাস্ট বোলারদের খেলতে সমস্যা হবে না।